নিউজ ডেস্ক | /APARADHSUTRA.COM
প্রতিবেদন প্রকাশ: ২৫ অক্টবার ২০২৬, সময়ঃ ০৭:৩৭
বিশেষ প্রতিনিধি:
ঘটনার সূচনা গত ২৬ আগস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ তারিখে। বাড্ডা থানা এলাকায় ওয়ারেন্ট তামিল ও মাদক উদ্ধার ডিউটিতে ছিলেন এসআই মোঃ হানিফ ও তাঁর সঙ্গীয় ফোর্স। আনুমানিক রাত ১০.০০ থেকে ১০.৩০ ঘটিকার সময় উত্তর বাড্ডা আলীর মোড় নূরম্যানশনের দ্বিতীয় তলায় বিকট চিল্লাচিল্লির আওয়াজ পেয়ে পুলিশ সেখানে উপস্থিত হয়।
তদন্তে জানা যায়, ওই বাসার বাসিন্দা রাবেয়া আক্তারের সাথে মোঃ মাসুদ নামের এক ব্যক্তির পরকীয়া সম্পর্ক ছিল। ঘটনার দিন মাসুদের স্ত্রী মজিরন বেগম বুঝতে পারেন যে, তাঁর স্বামী ঘরে না খেয়ে টিফিন ক্যারিয়ারে করে গোপনে খাবার নিয়ে রাবেয়া আক্তারের বাসায় গিয়েছেন। হাতেনাতে ধরতে মজিরন বেগম তাঁর মেয়ে ও দেবর মোঃ আরিফসহ ৪/৫ জন লোক নিয়ে রাবেয়া আক্তারের বাসায় হাজির হন এবং খাবারের বাটিসহ স্বামী মাসুদকে সেখানে পান। এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল বাকবিতণ্ডা শুরু হয়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত এসআই মোঃ হানিফ বিষয়টি পারিবারিক বিধায় উভয় পক্ষকে শান্ত করেন। তিনি মজিরন বেগমকে বিষয়টি শ্বশুর-শাশুড়ি ও মুরব্বিদের মাধ্যমে পারিবারিকভাবে সমাধানের পরামর্শ দেন এবং রাবেয়া আক্তারকেও অন্যের সংসার নষ্ট না করার আহ্বান জানিয়ে পরিবেশ শান্ত করে চলে যান। পরবর্তীতে তিনি বিষয়টি বাড্ডা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি)-কে অবহিত করেন এবং থানার সাধারণ ডায়েরিতে (জিডি) নোট রাখেন।
ঘটনার কিছুদিন পর, গত ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে মাসুদের বাবা এসআই হানিফকে ফোন করে জানান যে, পুলিশ মাসুদকে ধরে নিয়ে গেছে। ছুটি কাটাতে গ্রামে থাকা এসআই হানিফ খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন— মাসুদ ৩৮ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এবং গুলশান থানা এলাকায় একটি মিছিলের ঘটনায় পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করেছে।
মাসুদের বাবা এসআই হানিফকে অনুরোধ করেন ক্ষমতার অপব্যবহার করে হলেও তাঁর ছেলেকে যেন ছাড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এসআই হানিফ স্পষ্টভাবে জানান, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয় এবং গ্রেফতারকৃত আসামিকে বেআইনিভাবে ছাড়ানো তাঁর পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
তদবিরে ব্যর্থ হয়ে মাসুদের পরিবার ভিন্ন পথ অবলম্বন করে। মাসুদ গ্রেফতার হওয়ার পর তাঁর মা, ভাই মোঃ আরিফ ও খালা মিলে রাবেয়া আক্তারকে ফুসলিয়ে মাসুদের স্ত্রী ও মেয়ের বিরুদ্ধে থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করান। পরবর্তীতে পুলিশকে চাপ সৃষ্টি ও ব্ল্যাকমেইল করার উদ্দেশ্যে কথিত সাংবাদিকদের মাঠে নামানো হয়।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে নিজেকে ‘সাংবাদিক’ পরিচয় দিয়ে আসাদুজ্জামান সজীব (মোবাইল: ০১৬১১০৩৩৬৬০) নামক এক ব্যক্তি এসআই হানিফকে ফোন করেন। ঘটনার বর্ণনা শোনার পর সজীব মূল বিষয় থেকে সরে গিয়ে এসআই হানিফকে নানাভাবে দোষারোপ করতে থাকেন এবং কমিশনার অফিসে অভিযোগ দেওয়ার হুমকি দেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাবেয়া আক্তার থানায় যে অভিযোগটি জমা দিয়েছিলেন, তাতে এসআই হানিফের নাম বা সংশ্লিষ্টতার দূরতম কোনো উল্লেখ ছিল না।
এরপর গত ২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে কথিত সাংবাদিক আসাদুজ্জামান সজীব পুনরায় ফোন করে এসআই হানিফকে নানা বিভ্রান্তিকর প্রশ্ন করেন এবং ব্ল্যাকমেইলের সুর চড়িয়ে মিরপুরে গিয়ে বসে ‘বিষয়টি রফা/সমাধান’ করতে বলেন। অন্যথায় মিডিয়াতে ভুয়া সংবাদ প্রকাশ ও বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগের হুমকি প্রদান করেন।
এরপর ১৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে মোঃ আলমগীর হোসেন (মোবাইল: ০১৭১৮৩১৯২৮৩) নামে অপর এক ব্যক্তি ফোন করে পুলিশ কমিশনারের বরাবর অভিযোগ পাঠানোর কথা জানান। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই এআই (AI) প্রযুক্তির সাহায্যে প্রযুক্তিগত জালিয়াতি করে এসআই হানিফের ছবি বিকৃত করে "বাড্ডায় ৭৬ বছর বয়সী শাশুড়িকে পিটিয়ে সম্পত্তি দখলের অভিযোগ নেপথ্যে এসআই মোঃ হানিফ" শীর্ষক সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও ভিত্তিহীন সংবাদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা হয়।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
ভুক্তভোগী মাসুদের স্ত্রী মজিরন বেগম বলেন "আমার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে রাবেয়া আক্তারের সাথে পরকীয়ায় লিপ্ত ছিল। ঘটনার দিন আমি নিজের চোখে আমার স্বামীকে টিফিন ক্যারিয়ারে খাবার নিয়ে তার বাসায় যেতে দেখে হাতেনাতে ধরি। সেখানে চরম তর্কাতর্কি হলে পুলিশ এসে আমাদের শান্ত করে এবং পারিবারিকভাবে সমাধানের পরামর্শ দেয়। পুলিশ কর্মকর্তা হানিফ ভাই কোনো অন্যায় করেননি। কিন্তু পরবর্তীতে আমার স্বামী অন্য মামলায় গ্রেফতার হলে তার পরিবার ও কিছু অসৎ লোক উল্টো পুলিশকে ফাঁসাতে এবং আসল পরকীয়ার ঘটনা আড়াল করতে এই কাল্পনিক গল্প সাজিয়েছে।"
অভিযোগকারী (প্রথম ঘটনার) রাবেয়া আক্তার বলেন "ঘটনার দিন বাসায় গণ্ডগোল হওয়ার পর এসআই হানিফ স্যার এসে বিষয়টি মীমাংসা করে দিয়ে গিয়েছিলেন। ওই অভিযোগে উনার কোনো সম্পৃক্ততা বা দোষ ছিল না। কিন্তু মাসুদ গ্রেফতার হওয়ার পর তার ভাই আরিফসহ কয়েকজন আমাকে ভয়ভীতি ও চাপ দিয়ে থানায় একটি নতুন অভিযোগ দিতে বাধ্য করে। পরে তারা যে এই ঘটনাকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা চালাবে, তা আমি বুঝতে পারিনি।"
অভিযুক্ত এসআই মোঃ হানিফ (উপ-পরিদর্শক, বাড্ডা থানা) বলেন "আমি সেদিন শুধুমাত্র দায়িত্ব পালনকালে সেখানে উপস্থিত হয়ে পারিবারিক কলহ শান্ত করেছি এবং থানায় জিডি নোট রেখেছি। মাসুদ রাজনৈতিক মামলায় গ্রেফতার হওয়ার পর তার পরিবার অনৈতিকভাবে তাকে ছাড়িয়ে দেওয়ার জন্য আমাকে চাপ দেয়। আমি আইনের বাইরে গিয়ে কোনো কাজ করতে রাজি না হওয়ায় কিছু ভুঁইফোড় সাংবাদিককে দিয়ে এআই (AI) প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমার বিকৃত ছবি ও কাল্পনিক সংবাদ প্রকাশ করায়। এটি স্পষ্টত আমার সুনাম ক্ষুণ্ণ করার এবং ব্ল্যাকমেইল করে অনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা।"
অভিযোগকারী মাসুদের ভাই মোঃ আরিফ (ষড়যন্ত্রের মূল হোতা) বলেন "আমাদের অভিযোগ সত্য। এসআই হানিফ পক্ষপাতিত্ব করেছেন। আমরা আইনের আশ্রয় নিয়েছি এবং সাংবাদিকদের বিষয়টি জানিয়েছি।" তবে, মামলায় গ্রেফতার ভাইকে ছাড়ানোর তদবির ও পরকীয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
কথিত সাংবাদিক আসাদুজ্জামান সজীব (কথিত সম্পাদক/প্রতিবেদক) বলেন "আমরা যে তথ্য পেয়েছি সেটির ওপর ভিত্তি করেই সংবাদ প্রকাশ করেছি। কাউকে ব্ল্যাকমেইল করার উদ্দেশ্যে এটি করা হয়নি।" তবে, এআই দিয়ে ছবি বিকৃতি এবং ‘মিরপুরে বসে রফা/সমাধান’ করার প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান এবং ফোন কেটে দেন।
কথিত সাংবাদিক মোঃ আলমগীর হোসেন বলেন "আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছিল, তাই আমরা বিষয়টি সোশ্যাল মিডিয়ায় ও বিভিন্ন দপ্তরে জানিয়েছি। এখানে প্রযুক্তিগত জালিয়াতি বা ব্যক্তিগত কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।"
অনুসন্ধানী পর্যবেক্ষণ ও মূল সত্য
অনুসন্ধানে পরিষ্কার হয়ে উঠে এসেছে যে কোনো সম্পত্তি দখল বা নির্যাতনের ঘটনা ঘটেনি: পুরো বিষয়টি শুরু হয়েছিল টিফিন ক্যারিয়ারে করে পরকীয়া প্রেমিকার বাসায় খাবার নিয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে। সেখানে সম্পত্তি বা ৭৬ বছরের শাশুড়ির ওপর কোনো হামলার অস্তিত্বই ছিল না। এআই (AI) প্রযুক্তির অপব্যবহার: সাধারণ মানুষের সহানুভূতি পেতে এবং একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তাকে সামাজিকভাবে হেয় করতে এআই দিয়ে ছবি ও ভুয়া কনটেন্ট তৈরি করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতার পক্ষে তদবিরের ব্যর্থতা: রাজপথের মামলায় গ্রেফতার হওয়া আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদকে ছাড়াতে না পেরে তাঁর পরিবার ক্ষুব্ধ হয়ে এই ষড়যন্ত্রের ছক আঁকে। ভুঁইফোড় সাংবাদিকদের অপতৎপরতা: আসাদুজ্জামান সজীব গং কোনো নীতিবান সাংবাদিকতার চর্চা করেননি; বরং ‘মিরপুরে বসে সমাধানের’ প্রস্তাব দিয়ে তারা স্পষ্টত অনৈতিক আর্থিক সুবিধা বা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের চেষ্টা চালিয়েছেন।
পারিবারিক কলহ ও পরকীয়া সংক্রান্ত বিষয়কে পুঁজি করে এবং একজন আসামিকে ছাড়ানোর অনৈতিক আবদার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর এ ধরনের ভিত্তিহীন সংবাদ প্রকাশ— হলুদ সাংবাদিকতার এক নিকৃষ্টতম উদাহরণ। সত্যকে আড়াল করে কাল্পনিক তথ্য ছড়ানোর এই হীন মানসিকতা ও এতে জড়িত কথিত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
© অপরাধ সূত্র ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।