Shafiul
অপরাধ সূত্র :
বিশেষ প্রতিনিধি:
রাজধানী ঢাকা রূপ নিচ্ছে উঁচু অট্টালিকার আধুনিক নগরে। তবে এই ঝকঝকে আবরণের আড়ালে জমছে মারাত্মক অপরিকল্পিত ও অবৈধ নির্মাণের পাহাড়। রাজউকের নকশা এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালা তোয়াক্কা না করেই রাজধানীর বৃহত্তর মিরপুর, ভাষানটেক ও মাটিকাটা এলাকায় অবাধে গড়ে উঠছে একের পর এক বহুতল ভবন। জীবনের ঝুঁকি বাড়ালেও দেখার কেউ নেই। অভিযোগ উঠেছে, তদারকির দায়িত্বে থাকা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তার পকেট ভারী করেই পার পেয়ে যাচ্ছেন নিয়মভঙ্গকারী ভূমি মালিক ও ডেভেলপাররা।
রাজউক জোন-৩/১-এর আওতাধীন এলাকাগুলোতে সরেজমিন অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে নকশা জালিয়াতি ও নোটিশ বাণিজ্যের এক ভয়াবহ চিত্র। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী, ভবনের সামনে, পেছনে এবং দুই পাশে নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা ছাড়া বাধ্যতামূলক। এছাড়া ১০ তলা বা তার বেশি উচ্চতার ভবনের ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিভাগের ছাড়পত্রের পাশাপাশি স্মোক ও ফায়ার ডিটেক্টর, ফায়ার হাইড্রেন্ট এবং কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনের সুব্যবস্থা রাখা আবশ্যক। তবে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব এলাকার অধিকাংশ ভবন নির্মাণেই ন্যূনতম নিয়ম রক্ষা করা হয়নি।
আইন অমান্য করে কীভাবে এসব অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠছে—তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে মেলে রাজউকের ইমারত পরিদর্শক শরিফ হোসেন এবং তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ উৎকোচ গ্রহণের প্রত্যক্ষ তথ্য। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভূমি মালিক ও ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সাইট ইঞ্জিনিয়ার সরাসরি স্বীকার করেছেন, রাজউক কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের টাকায় ‘ম্যানেজ’ করেই তারা রাজউকের আইন বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ভবন নির্মাণ চালিয়ে যাচ্ছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, অত্র এলাকার ইমারত পরিদর্শক শরিফ হোসেন তার ব্যক্তিগত সহকারীর মাধ্যমে নিয়মভঙ্গকারী ভবন মালিকদের নোটিশ পাঠাতেন। পরে তাদের অফিসে ডেকে এনে নগদ অর্থের বিনিময়ে অভিযোগ নিষ্পত্তি করে দিতেন। তথাকথিত এই ‘নোটিশ বাণিজ্যে’র মাধ্যমে বিপুল অংকের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সম্প্রতি চূড়ান্ত উচ্ছেদ নোটিশ পাওয়া কয়েকটি ভবনের মালিককে ডেকে এনেও বিশাল অঙ্কের লেনদেনের মাধ্যমে উচ্ছেদ এড়ানোর সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। আর যেসব ভবনের মালিক চুক্তি বা ‘নেগোসিয়েশনে’ রাজি হননি, তাদের ভবনে সাজানো মোবাইল কোর্ট ও উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং মিটার জব্দ করার অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে এসব সংযোগ ফের চালুর জন্য ন্যূনতম ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায়ের তথ্য মিলেছে।
মাত্র কয়েক ঘণ্টার অনুসন্ধানে রাজউকের বিধি লঙ্ঘন করে নির্মিত বা নির্মাণাধীন শতাধিক ভবনের সন্ধান মিলেছে, যেগুলোর কোনোটির রাস্তা নিয়মমাফিক চওড়া নয়, আবার কোনোটির অনুমোদনই নেই।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ইমারত পরিদর্শক শরিফ হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
রাজউকের এক নগর পরিকল্পনাবিদ নাম প্রকাশ না করার শর্তে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "ইমারত পরিদর্শকরা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করলে ৭০ শতাংশ ভবনই সঠিক নিয়মে তৈরি হতো। অপরিকল্পিত এসব নির্মাণের মাশুল আমাদের দিতে হবে। ৬.৫ মাত্রার মাঝারি ধরনের কোনো ভূমিকম্প হলেই এই অপরিকল্পিত অট্টালিকাগুলো ডেথ ট্র্যাপে পরিণত হবে।"
অন্যদিকে, মাঠপর্যায়ের এমন দুর্নীতির কথা স্বীকার করে কিছুটা লাচার প্রকাশ করেছেন রাজউক জোন-৩/১-এর অথরাইজড অফিসার এফ.আর. আশিক। তিনি জানান, "আমরা অনেকটাই ইমারত পরিদর্শকদের ওপর নির্ভরশীল। তারা তথ্য গোপন করলে আমাদের করার অনেক কিছুই সীমিত হয়ে যায়। তবে নির্দিষ্ট কর্মকর্তা ও পরিদর্শকের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অনিয়মের তদন্ত করে খুব শিগগিরই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
রাজউকের কিছু অসাধু কর্মকর্তার অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার কারণে পুরো রাজধানীর সুরক্ষা আজ মারাত্মক হুমকির মুখে। এলাকাবাসীর দাবি, শুধু ভবন মালিকদের জরিমানা করাই যথেষ্ট নয়; বরং রাজউকের উৎকোচগ্রহণকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সেই সাথে অবৈধভাবে অর্জিত এসব বিপুল সম্পদের হিসাব বের করতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সচেতন নাগরিকরা।